পুরুলিয়া- ইসলামপুরের বাংলায় অন্তর্ভুক্তিকরণ

স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় যে দেশভাগের যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়েছিল বাঙালিকে, তার রেশ কিস্তু ছিল পরবর্তী সময়েও। বাংলা ভাষাকে আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছে দেবার কৃতিত্ব কেবলমাত্র বাঙালিদেরই। শুধুমাত্র ভাষার জন্য এমন আন্দোলন বিশ্বে আর কোনও দেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে বলে মনে হয়না। কিন্তু এতেই থেমে থাকেনি বাংলা ভাষাভাষী মানুষ। স্বাধীন ভারতেও ভাষার লড়াইয়ের নিদর্শন রয়েছে। অনেকেই হয়ত তা জানেন, আবার অনেকের কাছ তা অজানা এখনও। সদ্য আমরা পেরিয়ে এলাম পয়লা নভেম্বর। এই দিনটিতেই স্বীকৃতি পেয়েছিল দুটি আলাদা আলাদা জায়গা। জায়গা যেমন আলাদা,  তেমনি তার সংগ্রামও ছিল আলাদা। কিন্তু লক্ষ্য ছিল এক। অর্থাৎ নিজ অঞ্চলের ভাষার স্বীকৃতি। তাই নিয়েই আন্দোলনের জেরে নিজের অধিকার দখল করে নিতে পেরেছিল একদিকে পুরুলিয়া অপরদিকে ইসলামপুর। পুরুলিয়ার সমৃদ্ধ ইতিহাস রয়েছে আমরা সকলেই জানি। কিন্তু প্রচারে খানিক পিছিয়ে থাকলেও ইসলামপুর নিজ ঐতিহাসিক সম্ভ্রম নিয়ে বলীয়ান থেকেছে এবং নিজের অধিকার আদায় করে নিয়েছে সূর্যপুরী ভাষার স্বীকৃতি হিসেবে। সেই নিয়েই কিছু আলোকপাত হবে এবারের লেখায়।

         কালের গতানুগতিকতায় আবারো চলে গেল আর একটা পয়লা নভেম্বর। এই দিনটি এই কারণেই স্মরণযোগ্য যে আমাদের রুখা মাটি পুরুলিয়ার মানুষগুলোর মাতৃভাষায় অধিকারের লড়াই কে মনে করিয়ে দেয়। আর সেই লড়াইয়ের স্বীকৃতি স্বরূপ পুরুলিয়া জেলার পশ্চিমবঙ্গে অন্তর্ভুক্তিকরণ দিবস পহেলা নভেম্বর। বলতে দ্বিধা নেই পয়লা নভেম্বর তাই পুরুলিয়া জেলার জন্ম দিবস। পুরুলিয়ার স্থানীয় নাম পুরুল্যে। ১৯৭১ সালের পর থেকে সার্ভে অফ ইন্ডিয়া স্থানীয় মানুষের উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বানান বদলে রাখে পুরুলিয়া।

       একদা অখ্যাত একটি গ্রাম কালের দাক্ষিণ্যে ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ একটি জনপদে পরিণত হয়ে ১৮৩৮ সালে মানভূম জেলার সদর মহকুমা হয় পুরুলিয়া। বিহারের ছোটনাগপুর ডিভিশনের অন্তর্ভুক্ত ছিল মানভূম। পরবর্তীতে বাংলা ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ১৯৫৬ সালে পূর্বতন বিহার রাজ্যের মানভূম জেলার সদর মহকুমাটি পুরুলিয়া জেলা নামে পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্ভুক্ত হয়। পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম প্রান্তবর্তী জেলা পুরুলিয়া।

      প্রাচীন বজ্র ভূমির পূর্বাংশ পুরুলিয়া। জৈন গ্রন্থ ভগবতী সূত্র অনুসারে পূর্ব ভারতের ষোড়শ জনপদের একটি হলো পুরুলিয়া। বজ্র ভূমির দুর্গমতার কারণে ইংরেজ শাসনের পূর্ববর্তী ইতিহাস বিশেষ পাওয়া যায় না। প্রাচীন বিবরণ থেকে আমরা যেটুকু জানতে পারি তাতে এখানে ২ জনগোষ্ঠী ছিল -একটি রাঢ় অঞ্চল থেকে এসেছিল এবং পরিচিত ছিল রাজপুত হিসেবে, এরা বসতি স্থাপন করেছিল উর্বর উপত্যকায়। অপর জনগোষ্ঠী এখানকার আদি বাসিন্দা – রাজপুতদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সচ্ছলতার কারণে এই আদি বাসিন্দা বা ভূমিপুত্ররা ধীরে ধীরে পাহাড় ও জঙ্গল এলাকায় সরে যেতে বাধ্য হয়।

    ভৌগলিক ও প্রাকৃতিক দুর্গমতার কারণে এই অঞ্চলে বহিঃশত্রুর আক্রমণ তেমন ভাবে হয়নি। ১৫৯০ সালে মানসিংহ প্রথম তাঁর সৈন্যবাহিনী নিয়ে ঝাড়খণ্ডের মধ্য দিয়ে মেদিনীপুরে পৌঁছেছিলেন। পাঞ্চেত দুর্গ সম্ভবত এই সময়ই তৈরি হয়। কথিত আছে মানসিংহের নামে এই জনপদ মানভূম নামে পরিচিত।

    ১৭৬৫ সালে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার দেওয়ানি লাভ করার সময় ইংরেজদের এই অঞ্চল দখল করার জন্য দীর্ঘ ৩৩ বছর সংগ্রাম করতে হয়। এখানকার ছোট ছোট গোষ্ঠীপতি ও অধিবাসীরা তা মেনে না নেওয়ায় ১৭৬৯-৭০ সালে চুয়াড় বিদ্রোহ, ১৮৩২ সালে কোল বিদ্রোহ ও ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহ এই অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। সমস্ত অরণ্য অঞ্চল কে একই প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনার জন্য ১৮০৫ সালে মানভূম সহ তেইশটি পরগনা নিয়ে জঙ্গলমহল গঠিত হয়। তবুও বিদ্রোহের আগুন নেভেনা এবং জঙ্গলমহল পুনরায় ভেঙে ১৮৩৩ সালে মানভূম জন্মলাভ করে।

      ১৯১১ সালে মানভূমকে বাংলা থেকে আলাদা করে জোড়া হয় বিহারের সাথে। মানভূম ও ধলভূম ছিল প্রধানত বাংলাভাষী অঞ্চল। ফলে এই বিচ্ছেদ কেউ স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারেনি। তাই মানভূমে বাংলা ভাষা আন্দোলন শুরু হয় ১৯১২ সালে। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫৬ সালের মধ্যে ভাষা আন্দোলন তীব্র ভাবে ছড়িয়ে পড়ে এই অঞ্চলের বাঙ্গালিদের মধ্যে। মানভূমের এই আন্দোলন পৃথিবীর ইতিহাসে দীর্ঘতম ভাষা আন্দোলন। সেইসময় রাজনৈতিকভাবেই এই অঞ্চলে স্কুল কলেজ সরকারি দপ্তরে হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। বাংলাভাষী জনগণ হিন্দি ভাষার বিরুদ্ধে আন্দোলন করেন কিন্তু তাদের দাবি প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় পুরুলিয়ার আইনজীবীরা জাতীয় কংগ্রেস ত্যাগ করে আঞ্চলিক দল লোক সেবক সংঘ গড়ে তোলেন এবং বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় সুদৃঢ় আন্দোলন করেন।

          স্বাধীনতার পর ১৯৫৩‌ সালে রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন গঠিত হয়। ধানবাদ মহকুমার ওপর পশ্চিমবঙ্গের দাবি নাকচ করে কমিশন। কমিশন ধলভূম পরগনার কোনও অংশ বাংলায় জুড়তে রাজি হয়নি। মানভূমের জনগণ এর বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন। অবশেষে ১৯৮৬ সালের পয়লা নভেম্বর বিহার পশ্চিমবঙ্গ হস্তান্তর আইনের দ্বারা ভারত সরকার মানভূম জেলাকে একটি নতুন পুরুলিয়া জেলা নামে সংযুক্ত করেন| বাংলাকে দাপ্তরিক ভাষাকরণের দাবিতে বিহার রাজ্যের সাবেক মানভূম জেলার সংগঠিত আন্দোলন আমাদের ভাষা আন্দোলনের সংগ্রাম কে বারেবারেই স্মরণ করায়।

         অপরদিকে উত্তর দিনাজপুর জেলার একটি ছোট্ট সদর শহর ইসলামপুর। ইসলামপুর মহকুমার সদর দফতর ইসলামপুর শহরটি। ১৯৫৬ সালে বিহার রাজ্যের কিষাণগঞ্জের কিয়দংশ, গোয়ালপোখর, ইসলামপুর, চোপড়া থানা তথা ঠাকুরগঞ্জ এর কিছু অংশ এবং বিহারের কাটিহার এর গোপালপুর থানা অন্তর্ভুক্ত হয় পশ্চিম দিনাজপুর জেলার মধ্যে। ২১ শে মার্চ ১৯৫৯ এ তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ডঃ বিধান চন্দ্র রায়ের উদ্যোগে ইসলামপুর মহকুমা শহরটির জন্ম হয়।

    কথিত আছে জনৈক দিনাজ বা দিনারাজ, দিনাজপুর রাজপরিবারের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর নামানুসারে এই মৌজার নাম হয় দিনাজপুর। যা বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থিত। দেশভাগের পর দিনাজপুর জেলার পশ্চিমাংশ পশ্চিম দিনাজপুর নামে পশ্চিমবঙ্গে যুক্ত হয়। তারও পরে পশ্চিম দিনাজপুর জেলার উত্তরাংশ ও বিহারের কিষাণগঞ্জের ইসলামপুর অঞ্চল মিলে উত্তর দিনাজপুর জেলার আত্মপ্রকাশ ঘটে।

     অতীতে এই অঞ্চল অনেক প্রভাবশালী রাজার শাসনাধীনে ছিল। ১৫৮৫ সালে মুঘল সম্রাট আকবর বাংলা আক্রমণ করেন। মুঘল শাসন চালু হওয়ার পর দিনাজপুরে জমিদারি প্রথার প্রচলন হলেও দুই শত বৎসর এই অঞ্চলের কোনও বিশেষ উন্নতি সাধিত হয়নি। এ সময় পশ্চিম দিনাজপুরের তাজপুর এবং পানজারা সরকারের ইসলামপুর অঞ্চল পূর্ণিয়া পরগনার অংশ ছিল।

     ১৯৪২ এ তেভাগা ও অসহযোগ আন্দোলনে রায়গঞ্জ ,ইটাহার অগ্নিরূপ ধারণ করে, জেলা ভাগ নিয়ে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। দিনাজপুর জেলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় ১৯৪৭ সালে বাংলা ভাগের সময়। বালুরঘাট, রায়গঞ্জ এবং গঙ্গারামপুর মহকুমা পশ্চিম দিনাজপুরে যুক্ত হয় এবং বাকি দিনাজপুর পূর্ববঙ্গে দিনাজপুর নামে খ্যাত। এরপর স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে ১৯৫৬ সালে পশ্চিম দিনাজপুরের সাথে বিহারের বাঙালি সূর্যাপুরী অঞ্চল ইসলামপুর মহকুমাটি যুক্ত করা হয়। ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে জেলাটির উত্তর অংশ পৃথক করে উত্তর দিনাজপুর জেলার আত্মপ্রকাশ ঘটে। বহু ইতিহাসের সাক্ষী এই ইসলামপুর মহকুমা শহর।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s