লহ প্রণাম

কিছু মানুষের জন্ম হয় সমাজের জন্য কিছু অবদান রাখার কারণে। তেমনই সমাজকে, বলতে চাইছি শুধুমাত্র চলচ্চিত্র জগৎকেই নয়, একাধারে যেই ব্যক্তি চলচ্চিত্র, নাটক, থিয়েটার, কবিতা, বিদগ্ধ আলোচনা দিয়ে নিজেকে ক্রমাগত গড়েছেন, তিনি বিনোদন জগতকে ঋদ্ধ করার পাশাপাশি অবশ্যই ঋদ্ধ করেছেন সমাজের একটা বিশাল অংশকে। প্রচুর এমন মানুষ খুঁজলে পাওয়া যাবে, যাঁরা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের জ্ঞান, বুদ্ধিমত্তার ধারে কাছে না পৌঁছনো সত্ত্বেও তাঁকে যথেষ্ট মন থেকে শ্রদ্ধা করতেন।
আপামর বাঙালিকে কাঁদিয়ে বিদায় নিলেন বাঙালির ‘ফেলুদা-ক্ষিদ্দা-অপু’। আরও কত কী যে হয়ে উঠেছিল তাঁর পরিচয়! রবিবার হাসপাতালে বাবার মৃত্যুর ঘোষণা করার সময় তাঁর কন্যা পৌলমী বলেছিলেন, ‘দুঃখ করবেন না। আমার বাবার জীবন সেলিব্রেট করুন।’ আসলেই তাই। যে কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম, সেটার সারমর্ম তাই দাঁড়ায়। যে মানুষ বিভিন্ন স্তরে নিজের স্বাক্ষর রেখে গেলেন, তিনি সমাজকে দিয়েই গেলেন। এই সমাজ তাঁর কাছ থেকে পেল অনেককিছু। কাজেই সেগুলিকে সম্বল করে আমরা চাইলে নিজেরা যথেষ্ট ঋদ্ধ হতে পারি, চাইলে বর্তমান এই সমাজকে পরিশোধিত করতে পারি।
উত্তমকুমারের কিছুদিন পরে স্বয়ং সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা দিয়ে চলচ্চিত্র জগতে বিচরণ শুরু করেছিলেন যে ব্যক্তি, মহানায়কের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করে গেছেন নিজের স্বাতন্ত্র অভিনয় শৈলী বজায় রেখে। নিজেকে ভেঙেছেন বারে বারে। ‘অপুর সংসার’, ‘চারুলতা’, ‘ঘরে-বাইরে’ যেমন রয়েছে, তেমনি আছে ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’, ‘অশনি সঙ্কেত’, ‘গণদেবতা’, ‘স্ত্রী’, ‘সাত পাকে বাঁধা’। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে করছেন ‘বসন্ত বিলাপ’, ‘বাক্স বদল’, ‘তিন ভুবনের পারে’ প্রভৃতি তুমুল বিনোদনমূলক ছবি। ফেলুদা তো তাঁকেই ধারণ করে দেখা দিয়েছিল সকলের কাছে। উত্তমকুমার পরবর্তী সময়ে বাংলা ছবির দুর্দশার সময়েও দাঁড়িয়ে ছিলেন অভিভাবকের মতো। ইন্ডাস্ট্রিকে ধরে রাখতে বাছবিচার না করে নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন যে কোনও চরিত্র চরিত্রায়নে। সঙ্গে করে গিয়েছেন সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে বিভিন্ন ছবি। করেছেন ‘অন্তর্ধান’, ‘আতঙ্কে’র মতো ছবিও। ‘শাখা প্রশাখা’য় তাঁর অনবদ্য অভিনয় তেমন আলোচিত না হলেও যথেষ্ট দক্ষতার পরিচয় রাখে। তারপর আবার ছবির জগতে পরিবর্তন এলে স্বমহিমায় ফিরে আসেন। ‘পারমিতার একদিন’, ‘বরুণবাবুর বন্ধু’, ‘শেষের গল্প’ হয়ে হালের ‘বেলাশেষে’, ‘বসু পরিবার’, ‘৬১ নং গরপাড় লেন’, ‘বহমান’, ‘শ্রাবণের ধারা’, ‘ময়ূরাক্ষী’, ‘পোস্ত’, ‘সাঁঝবাতি’ প্রভৃতি ছবির তালিকা শেষ হবার নয়। শর্ট ফিল্ম ‘অহল্যা’তে তাঁর অভিনয় যথেষ্ট আলোড়ন ফেলেছিল।
এছাড়া থিয়েটারে ‘ফেরা’, ‘ঘটক বিদায়’, ‘কিং লিয়ার’ তাঁর অমোঘ সৃষ্টি এবং অভিনয়ের মাধ্যমে যুগান্তকারী হয়ে রয়েছে। লিখেছেন বহু কবিতা। পাঠ করেছেন আরও বেশি। তাঁর উদাত্ত কন্ঠ এবং পরিশীলিত তথা পরিচ্ছন্ন উচ্চারণ প্রতিটি কবিতায় আলাদা প্রাণ সঞ্চার করেছে। নিজের ব্যস্ত সময়ের মধ্যে এঁকে ফেলতেন ছবিও। সেগুলিও এক একটি অমূল্য সৃষ্টি। তাঁর বাগ্মিতা প্রসংশিত হয়েছে বিভিন্ন সময়ে।
৩২টি জাতীয় পুরস্কার সহ জীবনে পেয়েছেন প্রচুর দেশ-বিদেশের পুরস্কার। পেয়েছেন বহু গুণী মানুষের সান্নিধ্য। গোটা জীবনটাই সৃষ্টি-শিল্পের মেলবন্ধন করে গেলেন এবং আপামর বাঙালির জন্যে রেখে গেলেন সারা জীবনের শিল্পের ডালি। প্রণাম জানাই মহান এই শিল্পী তথা স্রষ্টাকে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s