নেতাজির ১২৫ তম জন্মজয়ন্তী শহরের উল্লেখযোগ্য দিন হয়ে রইল

নেতাজির ১২৫ তম জন্মজয়ন্তীর সকালে নেতাজি ভবনে নেতাজির মূর্তিতে মাল্যদান করার পর শ্যামবাজার থেকে রেডরোড পর্যন্ত এক বর্ণাঢ্য মিছিল করেন মমতা। বেলা ঠিক ১২ টা ১৫ মিনিট বাজতেই বেজে উঠল সাইরেন। শঙ্খ বাজিয়ে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ১২৫ তম জন্মজয়ন্তীতে দেশপ্রেমিককে শ্রদ্ধা জানালেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

এই মিছিলে হয়েছিল জনজোয়ার। সকালে তিনি গিয়েছিলেন নেতাজি ভবনে। আর মিছিল শেষে তিনি কেন্দ্রীয় সরকারকে তুলোধনা করেন। বিধানসভা নির্বাচনের আগে যা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যদিও নেতাজির বাড়িতে দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক কথা কতটা শোভন সে বিষয়ে একটা প্রশ্ন থেকেই যায়।


প্রধানমন্ত্রীকে তথা কেন্দ্রীয় সরকারকে উদ্দেশ্য করে এদিন বার্তা পৌঁছে দিলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর কথায়, ‘‌ভারতের প্ল্যানিং কমিশন তুলে দেওয়া হল। নীতি আয়োগ তৈরি হল। কেন্দ্র রাজ্যের সঙ্গে কথা বলে না। ন্যাশনাল প্ল্যানিং কমিশন ফিরিয়ে দিতে হবে। ভারতের রাজধানী কলকাতা হতেই হবে। বাংলা মাথা নীচু করতে পারে না। নেতাজির বই বাধ্যতামূলক করা উচিত স্কুল–কলেজে। তরুণের স্বপ্নকে সিলেবাসে রাখা হোক। ভারতের চারটে জায়গায় রাজধানী করা উচিত। উত্তর–দক্ষিণ–পূর্ব–পশ্চিমে একটা করে রাজধানী হোক।’‌


‘বাংলা থেকেই জাতীয় সঙ্গীত পেয়েছি। বাংলাই আমাদের দেশপ্রেম শিখিয়েছে। ‘নেতাজির চরণে মাথা নত করছি’, ভোটের আগে বাংলার মাটিতে দাঁড়িয়ে এ ভাষাতেই নেতাজি-স্মরণ করলেন এদিন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। এদিন পূর্ব পরিকল্পনা না থাকলেও প্রধানমন্ত্রী গিয়েছিলেন নেতাজি ভবনে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, নেতাজির নাম শুনলেই আবেগতড়িত হই। শক্তিসঞ্চারিত হয়। তিনি বলেন, শ্রদ্ধা জানাই নেতাজির মাকে। নেতাজিকে উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, বিশ্বে এমন কোনও শক্তি নেই যে ভারতকে পরাধীনতার শৃঙ্খলে বেঁধে রাখতে পারবে। তাঁর মুখে শোনা গেল বাংলা কথা।


ভিক্টোরিয়ার অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নেতাজি বলতেন, নিজের প্রতি সৎ হলে, বিশ্বের প্রতি অসৎ হতে পারবে না’। ‘আমার একটা কাজ করতে পারবে?’, শিশির বসুকে বলা নেতাজির এই কথাও বাংলায় বলেন নমো। ‘দেশ সর্বদা আপনার প্রতি চির কৃতজ্ঞ থাকবে।’ বলেন মোদী। অন্যদিকে, নেতাজির পাশাপাশি এদিন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রাজা রামমোহন রায়, মেঘনাদ সাহা, জগদীশচন্দ্র বসু, এস এন বোস, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, প্রণব মুখোপাধ্যায়দের নাম নিয়েছেন মোদী। পাশাপাশি সারদা দেবী, শ্রীচৈতন্যদেবেরও নাম নিয়েছেন নমো।


এদিকে ২০ জানুয়ারি ২০২১ তারিখে জাতীয় গ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষের প্রকাশ করা একটি নির্দেশিকা নিয়ে রীতিমতো ক্ষোভ ছড়িয়েছে গ্রন্থাগারের নিয়মিত পাঠকদের মধ্যে। ওই নির্দেশিকায় গ্রন্থাগারের ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক কে কে কোচুকোশি জানিয়েছেন, ২৩ জানুয়ারি কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি মন্ত্রক গ্রন্থাগারের বেলভেডিয়ার হাউসে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ১২৫তম জন্মদিন উপলক্ষে আন্তর্জাতিক সেমিনারের আয়োজন করেছে। ওই সেমিনারের আগত ‘ভিভিআইপি’দের নিরাপত্তার জন্য ২২ ও ২৩ জানুয়ারি রিডিং রুম পাঠকদের জন্য বন্ধ রাখা হবে। নির্দেশিকা জারি হওয়ার পর টানা দু’দিন রিডিং রুম বন্ধ রাখার এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি দেন জাতীয় গ্রন্থাগারের পাঠক শৈবাল চক্রবর্তী। এর পরেই সিদ্ধান্ত কিছুটা শিথিল করা হয়। নতুন একটি নির্দেশিকা প্রকাশ করে কোচুকোশি জানান, ২২ জানুয়ারি গ্রন্থাগারের রিডিং রুম বিকেল ৩টা ৩০ পর্যন্ত খোলা রাখা হবে। এই গ্রন্থাগার বন্ধের সিদ্ধান্তে যথেষ্ট ক্ষুব্ধ গ্রন্থাগারের নিয়মিত পাঠক তথা বিভিন্ন রকম গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা। গ্রন্থাগার বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন শিক্ষাবিদ পবিত্র সরকার। পুরাণবিদ নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী জাতীয় গ্রন্থাগার বন্ধ রাখার এই সিদ্ধান্তকে ‘স্বেচ্ছাচার’ বলে উল্লেখ করেছেন।


তবে আজকের দিনভর অনুষ্ঠানের সবচেয়ে চর্চিত বিষয় দিনের শেষেই অপেক্ষা করছিল। শতাব্দীপ্রাচীন ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে আগাগোড়া দূরত্ব বজায় রেখে গেলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কেন্দ্রের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। শনিবার প্রথম সাক্ষাতে নমস্কার বিনিময় হয়েছিল। মমতা উত্তরীয়ও পরিয়ে দিয়েছিলেন মোদীকে। জাতীয় গ্রন্থাগারের অনুষ্ঠান সেরে প্রধানমন্ত্রী আসেন ভিক্টোরিয়ায়।

সেখানে নেতাজির জন্মজয়ন্তী পালনের সূচনা অনুষ্ঠান ছিল। সেই অনুষ্ঠানের আগে দু’জনে ঘুরে দেখেন নেতাজিকে নিয়ে প্রদর্শনী। কোভিড বিধি মেনে মঞ্চে এবং মঞ্চের সামনে দু’জনের আসন পাশাপাশি থাকলেও দূরত্ব ছিল।


তারপর অপেক্ষা করছিল আরও কিছু। মুখ্যমন্ত্রী অনুষ্ঠানে বক্তৃতা বলতে ওঠার পর, সামনে থেকে ‘জয় শ্রী রাম; ধ্বনি ওঠে। কতিপয় বিজেপি কর্মী-সমর্থকের অবিমৃশ্যকারিতায় শনিবার তাল কেটে গেল ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে নেতাজি জয়ন্তী পালনের অনুষ্ঠানের। ক্ষুব্ধ, বিরক্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভাষণ না দিয়েই পোডিয়াম ছাড়লেন। তার পরেও অবশ্য সৌজন্যের খাতিরে আগাগোড়া মঞ্চে ছিলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু অনুষ্ঠানের মধ্যে শ্রদ্ধা এবং ভব্যতার সুর আর তেমন ভাবে ফিরে আসেনি। স্লোগান শোনার পর বিরক্ত হন মমতা। খানিক বিব্রত ঘোষক বলেন, ‘‘আপনারা একটু শান্ত হোন। ওঁকে (মমতাকে) কিছু বলতে দিন।’’ ক্ষুব্ধ মমতা পোডিয়ামের সামনে দাঁড়িয়ে প্রথমেই হিন্দিতে বলেন, ‘‘আমার মনে হয়, সরকারি অনুষ্ঠানের একটা শালীনতা থাকা উচিত। এটা কোনও রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি নয়। এটা সমস্ত দলেরই কর্মসূচি। জনতার কর্মসূচি।’’ সেখানেই না থেমে মমতা বলেন, ‘‘আমায় এখানে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য আমি প্রধানমন্ত্রী এবং কেন্দ্রীয় সংস্কৃতিমন্ত্রীর কাছে কৃতজ্ঞ। কিন্তু কাউকে আমন্ত্রণ করে অসম্মান (মমতা ‘বেইজ্জত’ শব্দটি ব্যবহার করেন) করাটা শোভনীয় নয়। এর প্রতিবাদে আমি এখানে কিছু বলছি না। জয় হিন্দ! জয় বাংলা!’’ এর পরেই মমতা পোডিয়াম ছেড়ে চলে গিয়ে নিজের আসনে বসেন। মমতার পরেই বলতে উঠে মোদী তাঁর ভাষণ শুরু করেন ‘বহেন মমতা’জি’ বলে। কিন্তু তাতেও গোটা অনুষ্ঠানের সুর ফিরে আসেনি।


শনিবারের কর্মূসচি ছিল একান্ত ভাবেই সরকারি। সেখানে রাজনীতির কোনও ছোঁয়া ছিল না। সকলেই দলমত নির্বিশেষে নেতাজিকে শ্রদ্ধা জানাতে সমবেত হয়েছিলেন। সেখানে ওই স্লোগান ওঠা অবাঞ্ছিত বলে বিজেপি নেতাদের একাংশও মনে করছেন। তাঁদের মতে, বিজেপি একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ দল বলেই পরিচিত। সেখানে এমন ধরনের অবিমৃশ্যকারিতা এবং বিশৃঙ্খলা শুধু অপ্রত্যাশিতই নয়, অভাবনীয়ও বটে। দলের এক প্রথমসারির নেতার কথায়, ‘‘অতি উৎসাহী কিছু লোকজন ওই ঘটনা ঘটিয়েছে। এমন হওয়া একেবারেই উচিত ছিল না।’’

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s